দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ। জাতীয় ক্লাউড অবকাঠামো শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে ন্যাশনাল ডেটা সেন্টারের (এনডিসি) ক্লাউড সক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি যশোরে নির্মাণাধীন একটি আধুনিক টিয়ার-থ্রি মানের ডেটা সেন্টার আগামী তিন মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার পথে রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারি তথ্য দেশের ভেতরেই সংরক্ষণ নিশ্চিত হবে, বাড়বে সাইবার নিরাপত্তা এবং শক্তিশালী হবে ডেটা সার্বভৌমত্ব। একই সঙ্গে দেশের ডিজিটাল রূপান্তরে এটি একটি কৌশলগত মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এনডিসির সক্ষমতা তিন গুণের বেশি বৃদ্ধি
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব সম্প্রতি তার ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে জানান, ন্যাশনাল ডেটা সেন্টারের স্টোরেজ, মেমোরি ও প্রসেসিং পাওয়ার—এই তিনটি মূল উপাদানের সক্ষমতা তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি নিউটানিক্স ও হুয়াওয়ে প্ল্যাটফর্মে ক্লাউড ক্যাপাসিটি সম্প্রসারণ, ভার্চুয়াল কন্টেইনারাইজড প্ল্যাটফর্ম-এজ-এ-সার্ভিস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল প্রশিক্ষণের জন্য জিপিইউভিত্তিক ক্লাউড সুবিধা চালু করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে পাঁচটি আধুনিক ক্লাউড ফ্যাসিলিটি গড়ে তোলার কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
যশোরে টিয়ার-থ্রি ডেটা সেন্টার, তৈরি হচ্ছে ডিজাস্টার রিকভারি সুবিধা
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, যশোরে নির্মাণাধীন ডেটা সেন্টারটি হবে দেশের অন্যতম বৃহৎ টিয়ার-থ্রি মানের ডিজাস্টার রিকভারি ডেটা সেন্টার। এটি চালু হলে রাজধানীর বাইরে একটি শক্তিশালী ব্যাকআপ অবকাঠামো তৈরি হবে, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কারিগরি বিপর্যয়ের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ডিজিটাল সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করবে।
তিনি বলেন, “এই অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে তরুণ প্রজন্মকে এআই, মেশিন লার্নিং ও অগমেন্টেড রিয়েলিটির মতো আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
কারা পাচ্ছে সরাসরি সুবিধা
এই ক্লাউড অবকাঠামোর সরাসরি সুবিধাভোগী হবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি সরকারি সফটওয়্যার প্রকল্পে যুক্ত দেশীয় আইটি প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ ও গবেষণা সংস্থাগুলোও এই সুবিধার আওতায় আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ডিজিটাল সেবাও এই অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সরকারি সংস্থার আইটি প্রকল্প ব্যবস্থাপক বলেন,
“দীর্ঘদিন ধরে আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম বিদেশি ক্লাউডে রাখতে হতো। এনডিসির সক্ষমতা বাড়ায় এখন দেশের ভেতরেই নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্যভাবে এসব সিস্টেম হোস্ট করা সম্ভব হবে।”
বিদেশি ক্লাউড নির্ভরতা কমবে, সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তিশালী জাতীয় ক্লাউড অবকাঠামো গড়ে উঠলে দেশের আইসিটি খাতে বহুমাত্রিক সুফল আসবে। এতে সরকারি ডেটা দেশের ভেতরেই সংরক্ষণ করা যাবে, কমবে বিদেশি ক্লাউড সেবার ওপর নির্ভরতা এবং সাশ্রয় হবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
একজন তরুণ স্টার্টআপ উদ্যোক্তা বলেন,
“দেশের ভেতরে কম খরচে ও নির্ভরযোগ্য ক্লাউড সেবা পেলে নতুন সফটওয়্যার ও এআইভিত্তিক পণ্য তৈরি অনেক সহজ হবে। এতে দেশীয় স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম আরও শক্তিশালী হবে।”
চ্যালেঞ্জের কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা
তবে এই বৃহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরছেন বিশেষজ্ঞরা। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সৈয়দ তাসনীম চৌধুরী বলেন,
> “ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড অবকাঠামো গড়ে তোলা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এটিকে কার্যকর ও টেকসই করতে দক্ষ মানবসম্পদ, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানের অপারেশনাল গাইডলাইন অপরিহার্য।”
তিনি আরও বলেন, নিয়মিত আপডেট, মনিটরিং এবং বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন হবে।
ভবিষ্যতের ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিত্তি
এ বিষয়ে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন,
> “আমাদের লক্ষ্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়; বরং ভবিষ্যতের ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিত্তি দৃঢ় করা।”
সব মিলিয়ে, এনডিসির ক্লাউড সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যশোরে নতুন টিয়ার-থ্রি ডেটা সেন্টার নির্মাণ বাংলাদেশের আইসিটি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিনিয়োগ। সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ সরকারি সেবার মানোন্নয়নের পাশাপাশি দেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের জন্য একটি শক্ত ও টেকসই ভিত্তি গড়ে তুলবে।
Reporter Name 
















