নওগাঁ-৩ আসনে জমে উঠেছে ভোটের মাঠ, হিসাব বদলে দিতে পারে বিদ্রোহ ও জোট রাজনীতি
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নওগাঁ-৩ (বদলগাছী–মহাদেবপুর) আসনে নির্বাচনি উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। গ্রামগঞ্জের অলিগলি, হাটবাজার, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই প্রার্থীদের প্রচারণা আর ভোটের হিসাব নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। দীর্ঘদিন পর এই আসন পুনরুদ্ধারের আশায় মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছেন বহিষ্কৃত বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী পারভেজ আরেফীন সিদ্দিকী জনি।
বিএনপির দীর্ঘ দখল, এরপর ক্ষমতার পালাবদল
রাজনৈতিক ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত টানা চারটি নির্বাচনে নওগাঁ-৩ আসনটি বিএনপির দখলে ছিল। তবে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আসনটি আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। প্রায় ১৭ বছর পর আবারও এ আসন পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে জোরেশোরে মাঠে নেমেছে বিএনপি।
এবার দলটির মনোনয়ন পেয়েছেন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং বদলগাছী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফজলে হুদা বাবুল। তিনি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ফজলে হুদা বাবুলের প্রতিশ্রুতি
নির্বাচনি প্রচারণাকালে ফজলে হুদা বাবুল বলেন,
“দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে জেল-জুলুম ও নির্যাতন উপেক্ষা করে জনগণের পাশে আছি। নির্বাচিত হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত আধুনিকায়ন, দুর্নীতি ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে কাজ করব।”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করা হবে, টাকা দিয়ে শিক্ষক নিয়োগের সংস্কৃতি বন্ধ করা হবে। পাশাপাশি বদলগাছী ও মহাদেবপুর উপজেলায় শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। দলীয় নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি ও ধান্দাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানান তিনি।
বিদ্রোহী প্রার্থী পারভেজ: বিএনপির জন্য বড় ধাক্কা
এই আসনে নির্বাচনের চিত্র জটিল করে তুলেছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত বিদ্রোহী প্রার্থী পারভেজ আরেফীন সিদ্দিকী জনি। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কলস প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। পারভেজ সাবেক ডেপুটি স্পিকার মরহুম আখতার হামিদ সিদ্দিকীর বড় ছেলে।
ধানের শীষের প্রার্থীর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নেমে তিনি জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছেন। বহিষ্কার প্রসঙ্গে পারভেজ বলেন,
“বহিষ্কার রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। আমি যেহেতু ধানের শীষের বিপক্ষে নির্বাচন করছি, তাই বহিষ্কার আসবেই—এটাই স্বাভাবিক।”
তিনি দাবি করেন, জনগণের অনুরোধেই তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
“আমার বাবা এ আসনে তিনবার সংসদ সদস্য ছিলেন এবং ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। মহাদেবপুরের মানুষ আমাকে নিরাশ করবে না,”—বলেন তিনি।
দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থান বিএনপির
এ বিষয়ে মহাদেবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রবিউল আলম বুলেট বলেন,
“আমিও মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলাম। কিন্তু দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, নেতাকর্মীরা তার পক্ষেই কাজ করবে ইনশাল্লাহ।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, যারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কাজ করবেন, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে দুজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সুযোগ কাজে লাগাতে মাঠে জামায়াত
বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সুযোগ কাজে লাগাতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা। ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা মাহফুজুর রহমান দাবি করেন,
“দাঁড়িপাল্লার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে যাচ্ছি, ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছেন।”
তিনি বলেন,
“আমাদের দলে চাঁদাবাজি নেই। নির্বাচিত হলে কৃষকদের সার-বীজ সহায়তা, জলাবদ্ধতা নিরসন, তরুণদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।”
অন্য দলগুলোর নীরব উপস্থিতি
এ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় পার্টি ও বাসদের প্রার্থীরা থাকলেও মাইকিং ছাড়া উল্লেখযোগ্য প্রচারণা চোখে পড়ছে না। ফলে মূল লড়াই সীমাবদ্ধ হয়ে উঠছে বিএনপি প্রার্থী, বিদ্রোহী স্বতন্ত্র এবং জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীর মধ্যেই।
শেষ মুহূর্তে বদলে যেতে পারে সমীকরণ
স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন রয়েছে, এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছলিম উদ্দিন তরফদার যেকোনো সময় কোনো এক প্রার্থীকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দিতে পারেন। এলাকাবাসীর ধারণা, তার নেতাকর্মীরা যদি সক্রিয়ভাবে কোনো প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামেন, তাহলে পুরো নির্বাচনি হিসাবই ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।
অনেক ভোটারের মতে, আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটারদের ভোট যিনি বেশি টানতে পারবেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবেন।
নওগাঁ প্রতিনিধি 
















