সংবাদ প্রতিবেদন
ঢাকা, ২ সেপ্টেম্বর: দেশের তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, নানা চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে আলোচনা করেছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। বুধবার দুপুরে বঙ্গভবনে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে।
বৈঠকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের সংকট ও সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে বিভিন্ন নীতিগত সুপারিশ উপস্থাপন করে বিজিএমইএ।
বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বলা হয়, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এলডিসি উত্তরণ বিলম্বিত করার সিদ্ধান্ত, নিষ্ক্রিয় ও বন্ধ পোশাক কারখানা পুনরায় চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা, নন-বন্ড কারখানার জন্য বন্ডেড কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরাসরি রপ্তানির সুযোগ এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করার মতো সরকারি উদ্যোগ শিল্প উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করেছে।
তবে সংগঠনটির দাবি, পোশাক খাত বর্তমানে তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বেশিরভাগ কারখানা সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করতে বাধ্য হচ্ছে। এতে রপ্তানি অর্ডার হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে বলে বিজিএমইএ জানিয়েছে।
উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংগঠনটির উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং মজুরি সমন্বয়ের কারণে গত তিন বছরে পোশাক উৎপাদনের খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসেও রপ্তানি ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগও স্থবির হয়ে পড়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও অর্ডার সংকটের কারণে গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলেও বৈঠকে জানানো হয়। এ পরিস্থিতিকে কর্মসংস্থানের জন্য উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে বিজিএমইএ।
জ্বালানি ও অবকাঠামোতে সুপারিশ
সংকট মোকাবিলায় দ্রুত দুটি নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের সুপারিশ করেছে বিজিএমইএ। এর মাধ্যমে আমদানি করা গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
১৫০ থেকে ৫০০ কেজি বয়লারবিশিষ্ট ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত গ্যাস সংযোগ এবং পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে স্বল্প সুদের বিশেষ ঋণ সুবিধারও প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
অবকাঠামো ও লজিস্টিকস উন্নয়নে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে বর্ধিত কার্গো শেড নির্মাণ এবং বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ দ্রুত শেষ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থায়ন ও বাণিজ্য সুবিধা
চলতি মূলধন ও বাণিজ্য ঋণের সুদের হার কমানো, পোশাক খাতের জন্য বিশেষ ‘পোস্ট-শিপমেন্ট ফাইন্যান্সিং স্কিম’ চালু এবং জিআইএফ ও টিডিএফ তহবিলে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিজিএমইএ।
ব্যবসা সহজ করতে কাস্টমস বন্ড অডিট প্রক্রিয়া সহজ ও প্রাতিষ্ঠানিক করার পাশাপাশি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
এলডিসি উত্তরণের পরও শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ধরে রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে এফটিএ, পিটিএ ও ইপিএ সম্পাদনে কৌশলগত উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
শ্রমিক কল্যাণ
শ্রমিক কল্যাণের অংশ হিসেবে গাজীপুরে পোশাক শ্রমিকদের জন্য আধুনিক হাসপাতাল ও কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণে দ্রুত জমি বরাদ্দের সুপারিশ করেছে বিজিএমইএ। একই সঙ্গে ঝুট ব্যবসাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানানো হয়েছে।
বৈঠকে বিজিএমইএ প্রতিনিধিদলের বক্তব্য সহানুভূতির সঙ্গে শোনেন রাষ্ট্রপতি। তিনি তৈরি পোশাক শিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ‘মেরুদণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, সাময়িক প্রতিকূলতা কাটিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখা জরুরি। শিল্পের টেকসই বিকাশ ও সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বিজিএমইএ প্রতিনিধিদলকে আশ্বস্ত করেন।

রিপোর্টার: পার্থ মজুমদার | স্টাফ রিপোর্টার | উজ্জ্বল আলো কর্মক্ষেত্র: সমগ্র বাংলাদেশ বিট: অর্থনীতি ও শিল্প 























