প্রারম্ভিকা
জাকার্তা, ১৬ আগস্ট ২০২৬: ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প ও পরবর্তী আফটারশকে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৭ জনে দাঁড়িয়েছে। শনিবার ভোরে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এরপর বিভিন্ন এলাকায় সুনামির ঢেউও দেখা যায়। ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ প্রশমন সংস্থা বিএনপিবি সর্বশেষ বিবৃতিতে নিহতের এ সংখ্যা জানিয়েছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি নাগেওকেওতে ভূমিধসের কারণে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। মোবাইল যোগাযোগও ব্যাহত হওয়ায় সেখানে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ভূমিকম্প ও উদ্ধার অভিযান ইন্দোনেশিয়ার ভূ-পদার্থবিদ্যা সংস্থা বিএমকেজি জানিয়েছে, স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৫৮ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর গভীরতা ছিল প্রায় ১৫ কিলোমিটার। এরপর বেশ কয়েকটি আফটারশক অনুভূত হয়। ফ্লোরেস দ্বীপের প্রধান শহর মাউমেরেতে উদ্ধারকারীরা ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন। সেখানে আরও ছয়জন আহত এবং দুজন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন বলে উদ্ধার সংস্থার প্রধান ফাথুর রহমান জানান। বিএনপিবির প্রধান সুহারিয়ান্তো জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বিভিন্ন ভবনে এখনো মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন। ভূমিধসের কারণে বেশ কয়েকটি সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। নাগেওকেওতে সড়কপথে পৌঁছানোর চেষ্টা ভূমিধসের কারণে ব্যর্থ হয়েছে। উদ্ধারকারী দলের আরেকটি অংশ ফেরিতে করে সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। ওই এলাকার প্রায় ২ হাজার বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সুনামির ঢেউ ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় এক মিটারের কম উচ্চতার সুনামির ঢেউ রেকর্ড করা হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা পর কর্তৃপক্ষ সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার করে। অস্ট্রেলিয়ার সুনামি সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সমুদ্রের নিচে সংঘটিত এই ভূমিকম্পের কারণে অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ড, দ্বীপ বা অঞ্চলগুলোতে সুনামির কোনো হুমকি নেই। ক্ষতিগ্রস্ত শত শত স্থাপনা প্রাথমিক হিসাবে ভূমিকম্পে ১৫৭টি বাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঝারি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪১টি এবং সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও ১৪৮টি বাড়ি। এ ছাড়া ৮৭টি স্কুল, ১৮টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পাঁচটি উপাসনালয় ও ছয়টি সরকারি কার্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে গেছে। নাগেওকেওতে বাড়িঘর, গুদাম ও সরকারি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সড়কে যানজটও সৃষ্টি হয়েছে। পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের গভর্নর এমানুয়েল মেলকিয়াদেস লাকা লেনা জানান, ভবন ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য
পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের তালিবুরা গ্রামের ৫১ বছর বয়সী বাসিন্দা নোনা জানান, ভূমিকম্পের কম্পন ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। তাঁর বাড়ির ভেতরে তখন ১৩ জন ছিলেন। কম্পন শুরু হলে সবাই দ্রুত বাইরে বেরিয়ে যান। মাউমেরে বন্দরের কাছে বসবাসকারী ৩৭ বছর বয়সী সিতি সালফিয়া বিরা জানান, কম্পন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উঁচু এলাকায় চলে যান। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল না হওয়ায় তারা বাড়িতে ফিরতে সাহস করছেন না। আতঙ্কে ঘর ছাড়েন মানুষ বিএনপিবি জানিয়েছে, পূর্ব নুসা তেংগারা, পশ্চিম নুসা তেংগারা ও দক্ষিণ সুলাওয়েসির বিভিন্ন এলাকায় শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়েছে। কোথাও কোথাও প্রায় এক মিনিট ধরে কম্পন স্থায়ী হয়। ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত হয়ে বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। এন্ডে জেলার একটি হাসপাতাল থেকে রোগীদের নিরাপদে বাইরে সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ফুটেজে দেখা গেছে। ওই এলাকায় অন্তত একটি ভূমিধসের খবর পাওয়া গেছে। ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি মাউমেরে বন্দরে ভূমিকম্পের সময় একটি ভবনের অংশ ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিতদের সন্ধানে উদ্ধারকারীরা তল্লাশি চালাচ্ছেন। বিএনপিবি জানিয়েছে, নাগেওকেওতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে এবং বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত থাকায় সেখানে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি।
পটভূমি
ইন্দোনেশিয়া ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত। প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে থাকা এই ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলে টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে দেশটিতে প্রায়ই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। বিএমকেজি জানিয়েছে, একই অঞ্চলে ১৯৯২ সালে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। ওই ভূমিকম্পে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছিল। এর আগে ২০১৮ সালে সুলাওয়েসি দ্বীপের পালু শহরে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পের পর ভয়াবহ সুনামি আঘাত হানে। ওই ঘটনায় ৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন।
প্রশাসনের বক্তব্য
ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগ প্রশমন সংস্থা বিএনপিবি উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের কাজ করছে। দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে সড়কপথের পাশাপাশি ফেরি ব্যবহার করে উদ্ধারকারী দল পাঠানোর চেষ্টা চলছে।
পরিবার ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
প্রদত্ত তথ্যে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্কের কথা জানা গেলেও এ বিষয়ে অতিরিক্ত কোনো তথ্য সংযোজন করা হয়নি।
উপসংহার
ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ৪৭ জনে পৌঁছেছে। শত শত বাড়িঘর ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভূমিধস ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত থাকায় বিশেষ করে নাগেওকেওতে উদ্ধারকাজ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সেখানে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে পারলে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির আরও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

উজ্জ্বল আলো 






















