প্রারম্ভিকা (Lead)
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৩ এএম
ইরানে দুটি প্রাণঘাতী হামলায় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধাপরাধ করেছে বলে বিশ্বাস করার মতো ‘যৌক্তিক ভিত্তি’ রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের স্বাধীন মানবাধিকার তদন্ত মিশন। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের জন্য তৈরি নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং লামের্দের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে হামলা হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, দুই ঘটনায় অন্তত ১৭৭ বেসামরিক মানুষ নিহত হন। তদন্ত মিশনের দাবি, হামলাগুলোতে বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এগুলো নির্বিচার হামলা ছিল।
মিনাবের বিদ্যালয়ে হামলা
তদন্ত মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যুদ্ধ শুরু করার দিন মিনাবের শাজারেহ তাইয়্যেবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ওই হামলায় অন্তত ১৫৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ১২০ জন শিশু বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদ্যালয়টির পাশে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) একটি নৌঘাঁটি ছিল। সেদিন ওই ঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তদন্ত মিশনের বিশেষজ্ঞদের দাবি, বিদ্যালয়টি স্পষ্টভাবে একটি বেসামরিক স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত ছিল এবং সেটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হওয়ার কোনো তথ্য তারা পাননি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গণমাধ্যমের প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একটি প্রাথমিক তদন্তে মিনাব হামলার জন্য মার্কিন বাহিনীকে দায়ী করার তথ্য পাওয়া গেছে। সংঘাতে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে—এমন তথ্যও তদন্ত মিশন বিবেচনায় নিয়েছে।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিদ্যালয়ে হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রই চালিয়েছে বলে বিশ্বাস করার মতো যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা।
তাদের মতে, বিদ্যালয়টিই হামলার লক্ষ্য ছিল। অন্য কোনো লক্ষ্যবস্তুতে চালানো হামলার ভুল আঘাত বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বিদ্যালয়টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়টিতে দুইবার আঘাত হানা হয়েছিল।
লামের্দে দ্বিতীয় হামলা
একই দিনে লামের্দ শহরের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্স ও আবাসিক এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটে। তদন্ত মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (পিআরএসএম) থেকে টাংস্টেনের ধাতব কণার মেঘ ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ওই হামলায় অন্তত ২১ বেসামরিক মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে সাতজন শিশু।
তদন্ত মিশনের বিশেষজ্ঞরা জানান, ক্রীড়া কমপ্লেক্সটিও বেসামরিক স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত ছিল। এটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হওয়ার কোনো তথ্য তারা পাননি।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্র থাকার তথ্যসহ বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে লামের্দে হামলাটি যুক্তরাষ্ট্র চালিয়েছে বলে বিশ্বাস করার মতো যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য
যুক্তরাষ্ট্র আগে লামের্দে হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করেছে। একই সঙ্গে ওই হামলায় পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের খবরও প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটি।
মিনাবের ঘটনা নিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর তদন্ত চলছে বলে জানানো হয়েছে। তবে তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনো বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় না।
এ ছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেছেন, তদন্ত মিশনের প্রতিবেদনের ফলাফলকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করে না।
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ
দুই হামলার বিষয়ে তদন্ত মিশনের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘নির্বিচার হামলা চালিয়ে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু বা আহত হওয়া কিংবা বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করার’ যুদ্ধাপরাধ করেছে—এমন বিশ্বাসের যথেষ্ট যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে।
তবে প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি তদন্ত মিশনের প্রাপ্ত তথ্য ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে করা একটি অনুসন্ধানমূলক সিদ্ধান্ত; যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানে বিক্ষোভ দমনের অভিযোগ
জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চলা বিক্ষোভে দমন-পীড়নের মাত্রাকে অতীতের অভিযানের তুলনায় নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করেছেন তদন্তকারীরা।
তাদের ভাষ্য, ইরানের ৩১টি প্রদেশজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শী, স্বাস্থ্যকর্মী ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ছাদসহ বিভিন্ন উঁচু স্থান থেকে জনতার ওপর অ্যাসল্ট রাইফেল দিয়ে গুলি চালান।
বিক্ষোভকারীদের মাথা, বুক ও চোখে ধাতব ছররা গুলির আঘাতে গুরুতর জখম হওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে অনেকের স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর কথা বলা হয়েছে।
আটক ও চিকিৎসা নিতে বাধার অভিযোগ
তদন্তকারীরা আরও জানান, দমন-পীড়নের সময় নিরাপত্তা বাহিনী চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালিয়ে আহত বিক্ষোভকারীদের মারধর ও গ্রেপ্তার করে। কিছু স্বাস্থ্যকর্মীকেও গ্রেপ্তার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত মিশনের মতে, এর ফলে অনেক আহত ব্যক্তি জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা নিতে ভয় পেয়েছেন।
বিক্ষোভের সময় আটক কয়েক হাজার মানুষ নির্যাতন, একাকী কারাবাস এবং আইনজীবীর সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট অভিযোগে দ্রুত বিচার শেষে অন্তত ২৯ জন পুরুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলেও তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য
বিক্ষোভ দমনে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে তদন্ত মিশন।
ইরান সরকারের হিসাবে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজারের কিছু বেশি। তবে তদন্তকারীদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা এ হিসাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হওয়ার জোরালো কারণ রয়েছে।
ইরান সরকার দাবি করেছে, নিহতদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অথবা পথচারী।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (হ্রানা) জানিয়েছে, তারা ৭ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করতে পেরেছে। তাদের হিসাবে নিহতদের প্রায় সবাই বিক্ষোভকারী।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ
তদন্ত মিশনের বিশেষজ্ঞরা উপসংহারে বলেছেন, বিক্ষোভ দমনের সময় ইরানি কর্তৃপক্ষ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে।
তাদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড ব্যাপক ও পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত হামলার অংশ ছিল। এর মধ্যে হত্যা, বেআইনি আটক, নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেছেন।
তবে ইরান এখনো নতুন তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। এর আগে দেশটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভে অস্থিরতা উসকে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করে আসছে। নিহতদের জন্য তারা ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘দাঙ্গাকারীদের’ দায়ী করেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি
জাতিসংঘের তদন্ত মিশন বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে সতর্ক করেছে, ইরানের বেসামরিক মানুষ একদিকে নিজেদের সরকারের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের মধ্যে এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে প্রাণঘাতী সংঘাতের মধ্যে আটকা পড়েছে।
নিউজরুম নোট: প্রদত্ত তথ্যে ভুক্তভোগীদের পরিবারের পৃথক প্রতিক্রিয়া, স্থানীয় বাসিন্দাদের মন্তব্য এবং ইরানি সরকারের নতুন প্রতিবেদনের ওপর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাই এসব বিষয়ে কোনো বক্তব্য সংযোজন করা হয়নি।

উজ্জ্বল আলো 










