সংবাদ প্রতিবেদন
প্রারম্ভিকা
ঢাকা, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য সরকারের বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রপ্তানি, বিনিয়োগ ও আর্থিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে চলতি দশকে দেশের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পে ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইএসডিবি) অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মোস্তফা জুলফিকার হাসান এ তথ্য জানান।
অর্থনীতির লক্ষ্য
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে নতুন সরকার এসেছে এবং দেশের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা।
তারেক রহমান বলেন, এটি কোনো স্লোগান নয়, বরং একটি পরিকল্পনা। রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং আর্থিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে চলতি দশকে দেশের অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
তিনি আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটি উৎপাদনকেন্দ্র এবং এ অঞ্চলের প্রবেশদ্বারে পরিণত করা।
নতুন প্রবৃদ্ধির খাত
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প দেশের প্রথম প্রবৃদ্ধির গল্প তৈরি করেছে। এখন ইলেকট্রনিকস, ওষুধশিল্প, হালকা প্রকৌশল ও সবুজ শিল্পকে পরবর্তী প্রবৃদ্ধির খাত হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার।
তার ভাষায়, এমন শিল্পকারখানা প্রয়োজন, যেগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে এমন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে, যা মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি
সরকারের সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি হেলথ কার্ড চালুর কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানান।
বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সামনে থাকা বিভিন্ন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাত, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ব্যয় বৃদ্ধি উন্নয়নশীল অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো দেশ একা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে না। তাই অংশীদারত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আইএসডিবির সঙ্গে অংশীদারত্ব
বাংলাদেশ ও ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের মধ্যে নতুন ধরনের অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এ সহযোগিতা আরও উদ্ভাবনী, সাড়াপ্রদানকারী ও ফলভিত্তিক হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পরিবর্তিত উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
উন্নয়ন অর্থায়নের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে আইএসডিবি ও এর সহযোগী সংস্থাগুলোর ওপর বাংলাদেশ আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রকল্পে অর্থায়ন
বাংলাদেশ সরকার ও ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের মধ্যে ‘বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় শোধনাগারের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের জন্য ১,০০৪.২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও আইএসডিবি গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসেরের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ সচিবালয়ে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মিজানুর রহমান এবং আইএসডিবি গ্রুপের পক্ষে সংস্থাটির ডিরেক্টর জেনারেল (কান্ট্রি প্রোগ্রামস) আনাসি আইসামি চুক্তিতে সই করেন।
প্রকল্পটি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বাস্তবায়ন করবে।
বাড়বে পরিশোধন ক্ষমতা
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিপিসির বর্তমান পরিশোধন ক্ষমতা ১.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ৪.৫ মিলিয়ন মেট্রিক টনে উন্নীত হবে।
এর ফলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইউরো-৫ মানসম্পন্ন পরিবেশবান্ধব পেট্রোলিয়াম তেলের উৎপাদন বাড়বে এবং আমদানিকৃত পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ শুধু একটি জ্বালানি বিনিয়োগ নয়। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সক্ষমতায় একটি বিনিয়োগ।
আইসিএফ ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতা
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য স্বল্প খরচে অর্থায়নের একটি মাধ্যম হিসেবে ইসলামিক কনসেশনাল ফান্ড (আইসিএফ) প্রতিষ্ঠায় ড. আল জাসেরের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ আইসিএফ থেকে সুবিধা গ্রহণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান তিনি। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে সদস্য দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন সহায়তা আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
সম্ভাব্য প্রকল্প চিহ্নিত করতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা ঢাকায় আইএসডিবির আঞ্চলিক হাবের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।
সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ
আইএসডিবির বৃহত্তর ভূমিকার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সদস্য দেশগুলোর নিজ নিজ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে ব্যাংকটি সহায়তা করতে পারে।
তার মতে, কোনো সদস্য রাষ্ট্র জ্বালানি খাতে এগিয়ে থাকলে এবং অন্য কোনো দেশ অবকাঠামো খাতে এগিয়ে থাকলে আইএসডিবি তাদের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে।
প্রশাসনের বক্তব্য ও বর্তমান অবস্থা
চুক্তি স্বাক্ষরের পর আইএসডিবি গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আল জাসের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারে সহায়তা করার বিষয়ে তিনি অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ওসম্প্রসারণ প্রকল্পের জন্য অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের পরিশোধন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

উজ্জ্বল আলো 





















