সংবাদ প্রতিবেদন
প্রারম্ভিকা
ঢাকা, ২৭ আগস্ট ২০২৬: চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় কারাগারে থাকা খলনায়ক আশরাফুল হক ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের ঢাকা মেট্রো দক্ষিণের ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান ডনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানির সময় ডনকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।
রিমান্ড আবেদনে যা বলা হয়েছে
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী ১৯৯৬ সাল থেকে ছেলের মৃত্যুর ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করে আসছেন। মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের জন্য ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আবেদনে আরও বলা হয়, ডনকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মামলায় জড়িত অন্য সহযোগী আসামিদের অবস্থান শনাক্ত ও তাদের গ্রেপ্তারে সহায়তা হতে পারে।
এ ছাড়া বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ডন কী কারণে এবং কার ইন্ধনে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, সে বিষয়েও তথ্য জানার প্রয়োজন রয়েছে বলে রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আদালতে উভয় পক্ষের শুনানি
ডনের পক্ষে আইনজীবী তারিকুল ইসলাম জুয়েল রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানো
গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
গত ১২ আগস্ট ডনের পক্ষে জামিনের আবেদন করা হলেও আদালত তা নাকচ করে দেন।
সালমান শাহর মৃত্যু
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের একটি ফ্ল্যাটে মারা যান চিত্রনায়ক সালমান শাহ। তার প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন।
ছেলের মৃত্যুর পর প্রথমে অপমৃত্যু মামলা করেন তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ তুলে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করা হয়।
আদালতের নির্দেশে সিআইডি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়।
দীর্ঘ তদন্তের ইতিহাস
সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমান শাহর বাবা রিভিশন মামলা করেন। ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়।
দীর্ঘ তদন্তের পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।
২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নীলা চৌধুরী বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেন এবং ১১ জনের নাম উল্লেখ করেন। এরপর আদালত মামলাটি র্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়।
পরে রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির পর ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট র্যাবের তদন্ত বাতিল করে পিবিআইকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
এরপর নীলা চৌধুরী ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দিয়ে পুনঃতদন্তের আবেদন করেন। তবে ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর সিএমএম আদালত নারাজি আবেদন নাকচ করে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।
হত্যা মামলা পুনরায় গ্রহণ
পরবর্তী সময়ে সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে আবার রিভিশন করা হয়।
২০২৫ সালের ২০ জুন ঢাকার ৬ষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালতের বিচারক মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক রিভিশন গ্রহণ করে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা গ্রহণের জন্য রমনা মডেল থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন।
এরপর গত বছরের ২০ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম মামলাটি দায়ের করেন। এজাহারে বলা হয়, এজাহারনামীয় আসামিসহ অজ্ঞাতনামা পলাতক আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজশে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহকে হত্যা করেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারে নির্ধারিত হবে।
অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য
রিমান্ড শুনানিতে ডনের পক্ষে তার আইনজীবী রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন। এর বাইরে ডনের ব্যক্তিগত বক্তব্য বা মামলার অভিযোগ সম্পর্কে তার বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের বক্তব্য
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ইন্সপেক্টর মজিবুর রহমান ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
উপসংহার
আদালতের আদেশ অনুযায়ী আশরাফুল হক ডনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। দীর্ঘদিনের আলোচিত এ মামলায় নতুন তদন্তের অংশ হিসেবে তার কাছ থেকে কী তথ্য পাওয়া যায়, তা পরবর্তী তদন্তে স্পষ্ট হবে।

উজ্জ্বল আলো 





















