ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে চালানো সাম্প্রতিক হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ গোয়েন্দা সমন্বয় ছিল বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সংবেদনশীল সামরিক ও গোয়েন্দা বিষয় হওয়ায় তারা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
সূত্রগুলোর দাবি, হামলার প্রস্তুতির সময় মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) খামেনির অবস্থান ও চলাচল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে। কয়েক মাস ধরে তাঁর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অবস্থান ও অভ্যাস সম্পর্কে তুলনামূলক নির্ভুল ধারণা পায় সংস্থাটি।
সিআইএ জানতে পারে, শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলের একটি কমপ্লেক্সে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং সেখানে খামেনি উপস্থিত থাকতে পারেন। এই তথ্য পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের হামলার সময়সূচি পরিবর্তন করে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের মতে, নতুন গোয়েন্দা তথ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতেই সময় পরিবর্তন করা হয়।
ওই কমপ্লেক্সে ইরানের প্রেসিডেন্ট, সর্বোচ্চ নেতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কার্যালয় রয়েছে। ইসরায়েলের ধারণা ছিল, বৈঠকে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর প্রধান কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ, মিলিটারি কাউন্সিলের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী শামখানি, আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার সাইয়্যেদ মাজিদ মুসাভি, উপগোয়েন্দামন্ত্রী মোহাম্মদ শিরাজিসহ আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উপস্থিত থাকতে পারেন।
অভিযান শুরু হয় ইসরায়েল সময় ভোর ৬টার দিকে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমিতসংখ্যক যুদ্ধবিমান ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে এবং সেগুলোতে দীর্ঘপাল্লার, অত্যন্ত নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র সংযুক্ত ছিল। প্রায় দুই ঘণ্টা পাঁচ মিনিট পর, তেহরান সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে কমপ্লেক্সে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। হামলার সময় জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা একটি ভবনে অবস্থান করছিলেন; খামেনি পাশের আরেকটি ভবনে ছিলেন বলে দাবি করা হয়।
ইসরায়েলের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বার্তায় জানান, তেহরানের একাধিক স্থানে একযোগে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে একটি হামলা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বের শীর্ষ ব্যক্তিদের অবস্থানস্থল লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়। তাঁর দাবি, ইরান যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেও এ অভিযানে ইসরায়েল ‘কৌশলগত চমক’ দিতে সক্ষম হয়েছে।
হোয়াইট হাউস ও সিআইএ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
রোববার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, শনিবারের হামলায় রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী শামখানি ও মেজর জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন। এর আগে ইসরায়েল তাদের হত্যার দাবি করেছিল।
অভিযানসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বক্তব্য, দীর্ঘ প্রস্তুতি ও কার্যকর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই এ হামলা পরিচালিত হয়েছে। গত বছরের ১২ দিনের সংঘাতের পর ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের যোগাযোগ ও চলাচল বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই সাম্প্রতিক অভিযানে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় বলে দাবি তাদের।
গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ঘিরে উত্তেজনার সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র জানে খামেনি কোথায় অবস্থান করছেন এবং প্রয়োজনে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব। এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় ব্যবহৃত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের তথ্যই সাম্প্রতিক অভিযানে কাজে লাগানো হয়েছে।
এ ছাড়া ইরানের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অবস্থান সম্পর্কেও নির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে সূত্রের দাবি। কমপ্লেক্সে হামলার পরবর্তী ধাপে আরও কয়েকটি স্থানে আঘাত হানা হয়, যেখানে জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অবস্থান করছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
তবে ইরানের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একজন নিরাপদে সরে যেতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অভিযানে ইরানের গোয়েন্দা সংস্থার জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে 

















