সংবাদ প্রতিবেদন
প্রারম্ভিকা
ঢাকা, ১৩ আগস্ট ২০২৬: জুলাই অভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; দীর্ঘ ১৬ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, নির্যাতন ও আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. রফিকূল ইসলাম।
বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজে আয়োজিত ‘জাগ্রত জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে জুলাই আন্দোলনের পূর্বাপর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং আন্দোলনে চিকিৎসকদের ভূমিকা উঠে আসে।
জুলাই আন্দোলনের পটভূমি
ডা. রফিকূল ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনের সূচনা শুধু ২০২৪ সালে হয়নি। ১/১১-এর পর গণতন্ত্র হরণ এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, ২০০৯ সালের পর বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও আন্দোলন করেছেন। এ সময় অনেকে নিহত, গুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং মামলার কারণে অনেকে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ডা. রফিকূল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই ধারাবাহিক আন্দোলনের পর আবু সাঈদ, ওয়াসিম ও মুগ্ধদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়।
গুম ও নির্যাতনের তথ্য
দীর্ঘ সময় গুমের শিকার বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন ডা. রফিকূল ইসলাম। তিনি ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম ও ছাত্রনেতা জনিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করেন।
তিনি মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করেন, ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৬৯৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন, ৬৭৭ জন গুম হয়েছেন এবং ১ হাজার ৪৮ জন কারাগারে মারা গেছেন।
এ ছাড়া ২০০৯ সাল থেকে ২০২৫ সালের ৫ জুলাই পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মামলায় ৫৯ লাখ ২৯ হাজার ৪৯২ জনকে আসামি করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এসব পরিসংখ্যানের বিষয়ে অনুষ্ঠানে কোনো সরকারি বা স্বাধীন তদন্ত সংস্থার পৃথক বক্তব্য উল্লেখ করা হয়নি।
চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
জুলাই অভ্যুত্থানে চিকিৎসকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ডা. রফিকূল ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, তৎকালীন সরকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া চিকিৎসকদের পাশাপাশি চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আন্দোলনের সময় কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে অনিয়ম বা অসঙ্গতি ছিল।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, মুন্সিগঞ্জের শাওন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলেও তাঁর ডেথ সার্টিফিকেটে গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয় উল্লেখ থাকলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তা প্রতিফলিত হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
এ ছাড়া ২০১৫ সালে খিলগাঁওয়ের জনি গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনার ফরেনসিক রিপোর্ট বা সংশ্লিষ্ট নথি বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য অনুষ্ঠানে পাওয়া গেছে কি না, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
জবাবদিহির দাবি
ডা. রফিকূল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা প্রতিবেদন দেওয়া বা নথি গায়েবের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্টদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
তাঁর দাবি, তৎকালীন সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কিছু চিকিৎসক এখনও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন এবং পদায়ন ও পদোন্নতি পাচ্ছেন। তাঁদের ভূমিকা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
নিজের নির্যাতন ও কারাবরণের স্মৃতিচারণ
অনুষ্ঠানে নিজের ওপর নির্যাতন ও কারাবরণের কথাও তুলে ধরেন ডা. রফিকূল ইসলাম।
তিনি বলেন, তৎকালীন সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে একজন তৎকালীন সমন্বয়কের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। পরে কল রেকর্ডের মাধ্যমে তৎকালীন পুলিশ বিষয়টি অনুসরণ করেছিল বলে দাবি করেন তিনি।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ভূমিকার প্রশংসা
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী ডা. রফিকূল ইসলামের ভূমিকার প্রশংসা করেন।
তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সময় ডা. রফিকূল ইসলামের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় বিপুল পরিমাণ রক্তের প্রয়োজন হয়েছিল এবং ডা. রফিকূল ইসলাম রোগীর গোপনীয়তা বজায় রেখে রক্তের ব্যবস্থা করেছিলেন।
অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী জুলাই অভ্যুত্থানের পর পাওয়া বাংলাদেশে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মাজহারুল শাহীন।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানা সুমি, সহকারী অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান নোমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. নাদিম আহমেদ এবং পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিন অধ্যাপক ডা. আহমেদ সামি আল হাসান।
জুলাই আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেওয়া ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এবং আন্দোলনের সময়কার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
উপসংহার
অনুষ্ঠানে জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের আত্মত্যাগ স্মরণ করা হয়। একই সঙ্গে গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ আন্দোলনে নিহত, গুম ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করা হয়। ডা. রফিকূল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পৃথক বক্তব্য বা তদন্তের বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে অনুষ্ঠানে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।