অভিজ্ঞ ও নবীন নেতৃত্বের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা। তবে এবারের মন্ত্রিসভায় বড় দপ্তরের দায়িত্ব প্রথমবারের মতো পাওয়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সংখ্যাই বেশি। একই সঙ্গে জ্যেষ্ঠ নেতাদের কেউ কেউ তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। একাধিক মন্ত্রণালয় একজন মন্ত্রীর অধীনে দেওয়ার পাশাপাশি কোথাও কোথাও একাধিক প্রতিমন্ত্রীও রাখা হয়েছে—যা সমন্বয় নিয়ে আলোচনা তৈরি করেছে।
গত মঙ্গলবার তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের (প্রধানমন্ত্রীসহ) মন্ত্রিসভা শপথ নেয় জাতীয় সংসদ ভবন–এর দক্ষিণ প্লাজায়। এতে পূর্ণ মন্ত্রী ২৫ জন এবং প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। তাঁদের মধ্যে ৪১ জনই প্রথমবারের মতো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্টরা নিজ নিজ দপ্তরের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
বড় দায়িত্বে নতুন মুখ
টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন আমিন উর রশিদ। তাঁকে কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অতীতে এসব দপ্তর আলাদা আলাদা মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী সামলেছেন। তাঁর অধীনে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সুলতান সালাউদ্দিন (টুকু), যিনি এবারই প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
ঢাকা-১০ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়ে পূর্ণ মন্ত্রী হয়েছেন শেখ রবিউল আলম। তাঁর হাতে দেওয়া হয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন—এই তিনটি অবকাঠামোগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। এসব দপ্তরে গত কয়েক বছরে বাজেট বরাদ্দ ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিমাণ ছিল বেশি। তাঁর অধীনে প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন হাবিবুর রশিদ ও রাজীব আহসান—দুজনই প্রথমবার সংসদ সদস্য। একজন মন্ত্রীর অধীনে একাধিক প্রতিমন্ত্রী রাখার নজির বিরল বলেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
সিলেট জেলা থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়ে পূর্ণ মন্ত্রী হয়েছেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর ও আরিফুল হক চৌধুরী। আবদুল মুক্তাদীর শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। তাঁর অধীনে প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন শরিফুল আলম। আরিফুল হক চৌধুরী শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন; তাঁর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আছেন নুরুল হক।
জ্যেষ্ঠদের দায়িত্ব
বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী হয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী; এ দপ্তরে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকিকে। সালাহউদ্দিন আহমদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। আর ইকবাল হাসান মাহমুদ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হয়েছেন; তাঁর সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আছেন অনিন্দ্য ইসলাম।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন; প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন ইশরাক হোসেন। ব্যবসায়ী নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে; প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। এ জেড এম জাহিদ হোসেন পেয়েছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সরদার সাখাওয়াত হোসেন (বকুল)–কে। ভূমিমন্ত্রী হয়েছেন মিজানুর রহমান মিনু; প্রতিমন্ত্রী কায়সার কামাল।
টেকনোক্র্যাট ও বিশেষ নিয়োগ
সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নন—এমন ব্যক্তিকেও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এ বিধান অনুসারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন খলিলুর রহমান। প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে শামা ওবায়েদ ইসলামকে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে পূর্ণ মন্ত্রী না থাকায় প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকই কার্যত মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন।
সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বাজেট বরাদ্দ ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এবার একাধিক মন্ত্রণালয় একজন মন্ত্রীর অধীনে দেওয়ায় প্রশাসনিক সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি কেমন হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকার–ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দিয়ে সমন্বয় নিশ্চিত করা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন মুখের ওপর বড় দায়িত্ব অর্পণ করে সরকার একটি ভিন্নধর্মী বার্তা দিয়েছে। তবে কার্যকর সমন্বয়, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতাই শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভার সাফল্য নির্ধারণ করবে।